
শীতে আলুর মড়ক রোগের সময় চাষিদের উচিত আক্রান্ত গাছগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে অপসারণ করা। এছাড়া, সঠিকভাবে জমির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সঠিক সেচ এবং সঠিক জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।
আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ একটি গুরুতর রোগ যা প্রথমে আলুর পাতা, ডগা এবং কাণ্ডের কিছু অংশকে প্রভাবিত করে। যখন বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, তখন মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যে জমির অধিকাংশ ফসল আক্রান্ত হয়। সকালবেলা আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো একটি ছত্রাক দেখা যায়। আক্রান্ত এলাকায় পোড়া গন্ধ ছড়ায়, যা মনে করে যেন জমির ফসল পুড়ে গেছে। মড়ক রোগ দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যেমন আলুর জাত, গাছের বয়স, রোগের আক্রমণের সময় এবং আবহাওয়া। যদি যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে আলুর ফলন সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে। সংস্থাটি জানায়, শীতকালীন মৌসুমে এটি মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে, তাই কৃষকদের আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত আলুর মড়ক রোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে, যদি রাতের তাপমাত্রা ১০-১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ১৬-২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, এবং আর্দ্রতা ৯০% এর বেশি থাকে, তবে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ও বৃষ্টিপাতের ফলে এই রোগের জীবাণু আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছগুলোতে দ্রুত সংক্রামিত হতে পারে, ফলে ২-৩ দিনের মধ্যে মহামারি আকার ধারণ করে। কৃষকদের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন সাবধানতা অবলম্বন করেন এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেন।
মড়ক রোগ, বিশেষত আলুর লেইট ব্লাইট, একটি মারাত্মক রোগ যা প্রথমে গাছের গোড়ার এবং পাতায় ছোপ-ছোপ ভেজা হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই দাগগুলি দ্রুত কালো রং ধারণ করে, যার ফলে পাতা পচে যায়। সকালবেলা মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়, যা রোগের উপস্থিতির একটি স্পষ্ট লক্ষণ। ঠান্ডা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায়, এই রোগের কারণে আক্রান্ত গাছগুলি দ্রুত পচে যেতে পারে এবং ২-৩ দিনের মধ্যে ক্ষেতের সমস্ত গাছ মারা যেতে পারে। রোগে আক্রান্ত আলুর গাছে বাদামি থেকে কালচে দাগ পড়ে, যা সেই আলুগুলিকে খাবার অযোগ্য করে তোলে।
মড়ক রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে কৃষকদের কার্যকর উদ্যোগগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রথমত, রোগ হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার পর কৃষকদের সক্রিয় হওয়া উচিত। এরপর, অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এই স্প্রের মাধ্যমে গাছগুলো ভালোভাবে ভেজানো নিশ্চিত করতে হবে, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের জন্য পরামর্শ দিয়েছে যে যদি ফসল রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে জমিতে সেচ বন্ধ করতে হবে এবং প্রতি ৪-৫ দিন পর পর সঠিক পরিমাণে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। রোগ দেখা দিলে, নিজ ক্ষেত্র কিংবা পাশের ক্ষেত্রের জন্য ৭ দিন অন্তর অন্তর তিন ধরনের ছত্রাকনাশকের যে কোনো একটি মিশ্রণ (ম্যানকোজেব ৬০% + ডাইমেথোমর্ফ ৯%, ম্যানকোজেব ৫০% + ফেনামিডন ১০%, প্রোপিনেব ৭০% + ইপ্রোভেলিকার্ব, বা কার্বেনডাজিম ৫০%) ব্যবহার করে ২ গ্রাম পরিমাণ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে, গাছগুলিকে ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
এছাড়া, প্রাদুর্ভাব গুরুতর হলে ৩-৪ দিন অন্তর ছত্রাকনাশক মিশ্রণ স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার সময় কৃষকদেরকে হাত মোজা, সানগ্লাস, মাস্ক এবং অ্যাপ্রোন ব্যবহার করতে হবে এবং সবসময় বাতাসের দিকের দিকে স্প্রে করতে হবে। ছত্রাকনাশকের বোতল ও অন্যান্য জিনিস মাটিতে পুতে ফেলতে হবে এবং জমিতে স্প্রে করার পর সরঞ্জাম ও শরীর ভালভাবে পরিষ্কার করতে হবে। সাবান দিয়ে হাত, পা এবং শরীর ভালোভাবে ধোয়া প্রয়োজন।