
মুক্তা বাংলাদেশে সৌখিনতা ও আভিজাত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যা অলংকার এবং চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হয়। মুক্তা বিশেষত মিঠাপানির ঝিনুক থেকে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন অলংকার তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এটি ক্যালসিয়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবেও পরিচিত, যা হাঁস-মুরগী, মাছ ও চিংড়ির খাদ্যের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।
বাংলাদেশের মুক্তা সংগ্রহের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে মহেশখালী ‘পিংক পার্ল’ বা গোলাপী মুক্তার জন্য প্রসিদ্ধ। দেশের বিভিন্ন জেলা যেমন ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও সিলেট থেকে গুণগত উৎকর্ষ সম্পন্ন গোলাপী মুক্তা সংগৃহীত হয়। বঙ্গোপসাগর হচ্ছে প্রাকৃতিক মুক্তার একটি আশ্রয়স্থল, যেখানে অসংখ্য পুকুর, দিঘি, খাল-বিল এবং হাওর-বাঁওড় মুক্তা বহনকারী ঝিনুকসমৃদ্ধ।
মুক্তার প্রধান ব্যবহার হলো অলংকার তৈরি, তবে এটি কিছু জটিল রোগের চিকিৎসায় এবং ঔষধ তৈরিতে মুক্তাচূর্ণ হিসাবেও কার্যকরী। তাই মুক্তার উৎপাদনকারী ঝিনুকের খোলসও নানাবিধ অলংকার ও সৌখিন দ্রব্যাদির প্রস্তুতের কাজে লাগানো হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তার প্রতি এই অবদান দেশটির সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।
বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএফআরআই) জানিয়েছে যে, দেশের জলাশয়ে ঝিনুকে মুক্তা চাষ করে প্রতি একরে ৪০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব। ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রের পুকুরে তারা ঝিনুক থেকে দ্রুত মিঠাপানির মুক্তা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছেন। কৃত্রিম উপায়ে ঝিনুকে পাঁচ মাসে দুই থেকে তিন মিলিমিটার আকারের মুক্তা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে, যা পূর্বে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতো।
এই গবেষণার মাধ্যমে বাণিজ্যিক মুক্তা উৎপাদন করে প্রতি বছর ১৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং ২০ থেকে ৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিএফআরআই ১৯৯৯-০১ সালে প্রথম গবেষণা করেছিল, কিন্তু অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০-১১ সালে একটি ‘কোর’ গবেষণা প্রকল্পের অধীনে গবেষণা আবার শুরু হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঝিনুকে মেন্টাল টিস্যু ঢুকিয়ে কম গভীরতার পুকুরে ছাড়া হয় এবং পাঁচ মাসে মুক্তা উৎপাদন করা হয়, যা ‘রাইস পার্ল’ নামে পরিচিত।
গবেষণার ফলাফল নির্দেশ করে যে, একটি ঝিনুকে ১০ থেকে ১২টি মুক্তা জন্মে, এবং বাজারে প্রতিটি মুক্তার মূল্য ৫০ টাকা। প্রতি শতাংশে ৬০ থেকে ১০০টি ঝিনুক চাষ করা যায়, ফলে গড় হিসেবে প্রতি একরে ৮০০ মুক্তা উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য ৪০ হাজার টাকা। ঝিনুকের মাংসও মাছ ও চিংড়ির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মুক্তার চাহিদা বাড়ছে, এবং অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশে মুক্তাচাষে বিরাট সফলতা অর্জন সম্ভব হতে পারে, যা দেশের জনগণের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
