
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলাভূমি হাওর অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষকে সম্ভাবনার নতুন দ্বার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো রোপণের পূর্ববর্তী সময়কে কাজে লাগিয়ে কৃষকরা নতুন একটি ফসল লাভের সুযোগ তৈরি করছেন, যা পতিত জমির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং বোরো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকদের আর্থিক ঝুঁকি কমিয়ে আনবে। এ ঘটনায় টেকসই ও লাভজনক শস্যক্রমের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একটি গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে, যা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ৫ নং কেওয়ার জোর ইউনিয়নের কুড়ারকান্দি এলাকায় ধান গবেষণা প্রকল্পের মাঠ দিবসে প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম উপস্থাপন করেন। মাঠ দিবসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান, এবং এতে আরও উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য গবেষক এবং স্থানীয় কৃষকেরা।
‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাওর অঞ্চলে চলছে। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে প্রধান বাধাগুলি হলো আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি এবং খরা, যা উচ্চফলনশীল বোরো ধানের উৎপাদনকে প্রভাবিত করে।
বোরো ধান চাষে ঠান্ডাজনিত চাপ একটি গুরুতর সমস্যা, যা প্রজনন পর্যায়ে শীতের কারণে দানা বন্ধ্যত্বের সৃষ্টি করে, বিশেষ করে ডিসেম্বরের আগে রোপণের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে, ডিসেম্বরের পরে রোপণ করলে আগাম বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা হাওর অঞ্চলের ধান উৎপাদনকে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এই সংকট মোকাবেলায় বিকল্প ও নিরাপদ শস্যক্রম খুঁজে বের করা খুবই প্রয়োজন। হাওর অঞ্চলে পতিত-বোরো-পতিত শস্যক্রম ৪০% জমিতে প্রচলিত, ফলে রবি মৌসুমে অধিক জমি পতিত পড়ে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর স্বল্পমেয়াদি সরিষার চাষের মাধ্যমে অতিরিক্ত ফসল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কৃষকদের জন্য খাদ্য নিশ্চিত করবে।
গবেষণায়, ২০২৩-২০২৪ বর্ষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বারি ও বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাতের পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে ২০ নভেম্বর বপনকৃত বিনা সরিষা-৯ সর্বাধিক ফলন দেয়। সরিষার পরবর্তী ধানে গড় ফলন ছিল ৬.২ টন প্রতি হেক্টরে, যা শস্যক্রমকে লাভজনক করছে।
২০২৪-২০২৫ বর্ষে বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৭-এর পরীক্ষা বিভিন্ন সার ও বীজ হার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। সর্বোচ্চ ফলন অর্জিত হয় বিনা সরিষা-৯ থেকে এবং হাইব্রিড বোরো ধানের গড় ফলন ৬.৪ টন প্রতি হেক্টরে ছিল।
বর্তমানে ২০২৫-২০২৬ বর্ষের গবেষণা চলছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, হাওর অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
হাওর অঞ্চলে সরিষা চাষের প্রতিবন্ধকতা সমূহ এবং এর সম্ভাব্য সমাধানের উপর গবেষকদের বিশ্লেষণে জানা যায় যে, প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো নিয়মিত পানি নেমে না যাওয়ার কারণে সরিষা বপন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষত, উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমিতে সরিষা চাষ বেশি সন্তোষজনক, তবে অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির ফলে চাষে বিঘ্ন ঘটছে।
গবেষকরা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত পরিপক্ব সরিষার জাতের উন্নয়ন অপরিহার্য। কৃষকদের যুক্ত করে কমিউনিটি ফার্মিং শুরু করলে আবাদ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। এর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
নবীন কৃষক হাসন রাজা জানিয়েছেন যে, তিনি উঁচু জমিতে সরিষা চাষ শুরু করেছেন এবং লাভের প্রত্যাশা করছেন। অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলম জানান যে, কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের মাধ্যমে সরিষা চাষে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া সরিষা চাষ স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী এবং দেশের অর্থনীতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান মন্তব্য করেন যে, হাওর অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ বাড়ছে এবং সরিষা লাভজনক হয়ে উঠছে। সামগ্রিকভাবে, এ গবেষণার মাধ্যমে হাওরের সরিষা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
