
রাজশাহী অঞ্চলের সবজি চাষ বর্তমানে একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কার্যকলাপে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর ৩,৩০০ হতে ৩,৪০০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়, যেখানে পুঠিয়া বেগুন বিশেষভাবে পরিচিত। রাজশাহী গত কয়েক বছরে দেশের মধ্যে সবজি চাষে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সবজি চাষের মাধ্যমে আয়ের পরিমাণ আমের চেয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বেশি। সবজি চাষের জমি গত ১০ বছরে ১০,০০০ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে এখন ৩৩,০১৫ হেক্টরে পৌঁছেছে।
দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন এ ক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে, যেখানে জমির ইজারা মূল্য প্রতি বিঘায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবজি চাষ থেকে ১,২৫৭ কোটি ১০ লাখ টাকা আয় করা হয়েছে, যেখানে আম চাষ থেকে আয়ের পরিমাণ ৮০১ কোটি ৫ লাখ টাকা।
গোদাগাড়ী উপজেলায় টমেটো চাষের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য, যেখানে ৩,২৯৮ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা জমি ইজারা নিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লাভ অর্জন করছেন। বিশেষ করে মাসুদ রানা, যিনি আগামী বাঁধাকপি ১৩৮ হেক্টর জমিতে চাষ করছেন, জানিয়েছেন যে চলতি বছর ৪ বিঘা জমির কপি উৎপাদন করে প্রায় ৪ লাখ টাকা লাভ করেছে।
এছাড়া, বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষে কৃষকরা এখন আরও বেশি ঝুঁকছে, আমবাগান কমিয়ে উচ্চমূল্যের সবজি চাষের দিকে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো কৃষকদের জীবনে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, যা তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
উপজেলার গোলাই গ্রামের চাষি হুমায়ুন কবীর (৪৭) এবারে ১৩ কাঠা জমিতে পটোল চাষ করেছেন এবং গত পাঁচ মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকার পটোল বিক্রি করেছেন। তার জমির ইজারা ও খরচ ২৬ হাজার টাকা বাদ দিয়ে বাকি সমস্তটাই মুনাফা, যা তার পরিবার পরিচালনার জন্য মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, পটোলের বিক্রি সপ্তাহে দুইবার হয় এবং তা হাতে হাতে চলে যায়। এই চাষ থেকে পরিবারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা—সবকিছুই তিনি পরিচালনা করতে পেরেছেন।
হুমায়ুন আরও দুই বিঘা জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছেন, এবং তার মন্তব্য হলো, “এই সবজি এখন সংসারের সুখের মূল।” জেলার মোহনপুর ও পবা উপজেলা বর্তমানে পটোল চাষের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। রাজশাহী-নওগাঁ সড়কে যাওয়ার পথে বিশাল পটোলের ক্ষেত দেখা যায়।
গোদাগাড়ীর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঈশ্বরীপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার জানিয়েছেন, গত দশ বছরে তার ব্লকে বছরে দুবার শুধু ধান ফলানো হত। তারা কৃষকদের সবজি ও উচ্চ মূল্যের ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন, ফলে বর্তমানে চাষিরা উঁচু জমিতে একাধিক ফসল চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। পবা উপজেলার দামকুড়া হাটের ব্যবসায়ীরা ১০-১৫ বছর আগে সবজি রাজশাহী শহর থেকে এনে বিক্রি করতেন, কিন্তু বর্তমানে এলাকায় উৎপাদিত সবজি এখন ঢাকার কারওয়ান বাজারে যাবে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার সবজি চাষে গত ১৫-২০ বছরে বিপ্লব ঘটেছে। চাকরির খোঁজ না করে অনেক কৃষক এখন সবজি চাষে ঝুঁকছেন। উদাহরণ হিসেবে, জয়নগর ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামের কৃষক বায়েজিদ হোসেন, যিনি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়েছেন, আড়াই বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করছেন। তিনি জানাচ্ছেন, তাঁর উৎপাদন খরচ দ্রুত উঠে গেছে এবং এখন তিনি লাভের মুখ দেখছেন। বায়েজিদ আরো জানান, তাঁর কাছে ১২-১৩ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসলের চাষের পরিকল্পনা রয়েছে এবং কোন চাকরিতে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন না।
এছাড়া, রাজশাহীতে ৩,৩০০ থেকে ৩,৪০০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়। পুঠিয়া এলাকা বিশেষভাবে বিখ্যাত তাল বেগুনের জন্য। নন্দনপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম বেগুন চাষি থেকে ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন এবং ঢাকায় বেগুন রপ্তানি করছেন। তিনি আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে ১০০ মণ পর্যন্ত বেগুন পাঠান, তবে এখন মৌসুম না থাকা সত্ত্বেও তিনি গত ৬ ও ৭ নভেম্বর যথাক্রমে ৫৫ ও ২৫ মণ বেগুন ঢাকায় পাঠিয়েছেন। এ তাঁতীর অভিমত, বেগুন চাষ করে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং নিজের বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন।
এছাড়া, রাজশাহীতে আলুর চাষও উল্লেখযোগ্য, যেখানে গত বছর ৩৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছিল এবং এবারের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হাজার হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন জানান, আগে কৃষি ছিল জীবিকার জন্য, তবে বর্তমানে এটি ব্যবসায়িক উপায় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যগত কারণে সবজি খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা সবজির চাহিদা বৃদ্ধি করছে। কৃষকদের জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং কীটনাশক ব্যবহারে সতর্ক থাকার জন্যও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
