দেশের শস্য ভাণ্ডারে যোগ হতে যাচ্ছে দুটি হাইব্রিডসহ আরও ছয়টি নতুন ধানের জাত। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উদ্ভাবিত এই ছয়টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত আজ কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় অবমুক্ত করা হয়েছে। সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান-এর সভাপতিত্বে ব্রি মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে একটি ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ জাত, একটি লবণাক্ততা সহনশীল, একটি ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী, একটি হাওরাঞ্চলের উপযোগী ও ঠান্ডা সহনশীল এবং দুটি লজিং টলারেন্ট কিংবা ঢলে পড়া প্রতিরোধী হাইব্রিড জাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সবগুলো নতুন জাত যোগ করার পর বিআরআরআই-এর উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা ১২৭টিতে পৌঁছালো।
ব্রি ধান ১১৫ এবং ব্রি ১১৬ বাংলাদেশের দুটি নতুন উদ্ভাবিত ধানের জাত, যা আবাদে উচ্চ ফলনশীলতা এবং পুষ্টিগুণের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রি ধান ১১৫ একটি কালো চালের জাত, যা এন্ডের কালচার পদ্ধতি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে। এ জাতটির গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৭.৪ টন এবং জীবনকাল ১৩৭-১৪২ দিন। এই ধানের গাছের গড় উচ্চতা ১০০ সেমি এবং এর দানার রঙ কালো, যা কালচে বাদামি রঙের। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম, অ্যামাইলোজ ২৩ শতাংশ এবং ভিটামিন ই ও সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইডের (সি৩জি) পরিমাণ যথাক্রমে ১৪.৯৮ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ২৯.১২ মিলিগ্রাম/কেজি। এছাড়াও, প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৩৬.৬১ ইউএম এএই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।
অন্যদিকে, ব্রি ১১৬ বোরো মৌসুমে চাষের জন্য একটি উচ্চ ফলনশীল জাত। এর গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন এবং গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৮.৫৯ টন। ব্রি ৯২ জাতের তুলনায়, ব্রি ১১৬ প্রায় ১৩.৭৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয় এবং সঠিক পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনা করা হলে, এর ফলন ১০.৩৬ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এই জাতের গাছ শক্ত এবং হেলে পড়ে না, এবং এর ডিগ পাতা দীর্ঘ হওয়ায় ধানের শীষ দেখা যায় না। অর্থাৎ, ব্রি ১১৬ জাতটি ব্রি ধান ৯২ এর সমসাময়িক একটি উন্নত মানের জাত হিসেবে আবাদ করা যেতে পারে।
ব্রি ১১৭ এবং ব্রি ১১৮ ধানের জাত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করা হয়েছে। ব্রি ১১৭ একটি স্বল্প জীবনকালীন (১২৯-১৩৫ দিন) জাত যা লবণাক্ততা সহনশীল এবং ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে সক্ষম। এর গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৮.৬ টন, তবে সঠিক পরিচর্যায় তা ৯.৯০ টন পর্যন্ত বাড়তে পারে। দানার আকার মাঝারি মোটা এবং সোনালী বর্ণের, যার অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৪.২% এবং প্রোটিনের পরিমাণ ৯.৩%। ভাত ঝরঝরে হওয়ায় এই জাতের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ব্রি ১১৭ ব্লাস্ট রোগের বিরুদ্ধে উচ্চ মাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে (স্কোর ০-৩)।
অন্যদিকে, ব্রি ১১৮ জাতটি হাওর অঞ্চলের জন্য উপযোগী ঠান্ডা সহনশীল। এটি প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডা সহনশীল থাকায় বন্যায় ধান ডুবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। আগাম বপনে (২৫ অক্টোবর-১ নভেম্বর) ফলন হবে কমপক্ষে ৬.০ টন, जबकि স্বাভাবিক সময়ে (১৫-২০ নভেম্বর) বপনে ১৪৫ দিনে ফলন হতে পারে ৬.৯-৮.৫ টন। ব্রি ১১৮ এর চালের আকারও মাঝারি মোটা, ভাত সাদা এবং ঝরঝরে। এর চালের অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৮.৩% এবং প্রোটিনের পরিমাণ ৯.১%। প্রস্তাবিত জাতের পরীক্ষায় ব্রি ১১৮ ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে প্রায় ২২.৮৩% বেশি ফলন প্রদর্শন করেছে।
ব্রি হাইব্রিড ধান ৯ একটি লজিং টলারেন্ট ধানের প্রজাতি যা ঢলে পড়া প্রতিরোধী এবং মাঝারি মাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল। এটি ৪-৮ ডিএস লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে, এবং এর দানার আকৃতি মাঝারি, যেখানে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৬ শতাংশ। এক হাজার দানার ওজন ২৫.৫ গ্রাম এবং দানায় প্রোটিনের পরিমাণ ৯.৩ শতাংশ। এই ধানের জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন এবং কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৫-১০.৫ টন, যখন উপকূলীয় অঞ্চলে ফলন ৬.৫-৭ টন।
অন্যদিকে, ব্রি হাইব্রিড ধান ১০ও লজিং টলারেন্ট এবং এর দানার আকৃতি চিকন। এর অ্যামাইলোজ পরিমাণ ২৩.৫ শতাংশ, এক হাজার দানার ওজন ২৩.৭ গ্রাম এবং দানায় প্রোটিনের পরিমাণ ৯.১ শতাংশ। জীবনকাল এটিরও ১৪৫-১৪৭ দিন এবং কৃষকের মাঠে ফলন ৯.৭-১০.৭ টন।
এছাড়া, ব্রি উদ্ভাবিত ৩৯টি জাত বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা সহ বিভিন্ন ধরনের বৈরী পরিবেশের প্রতি সহনশীল। এই উদ্ভাবনগুলি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ফলে বর্তমানে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ। স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ২০ শতাংশ ছিল, এখন তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এই সময়কালে জনসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়েছে, তবে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।